| জেলা প্রশাসনের পটভূমি |
|
সুদূর অতীত কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত লালমনিরহাট অঞ্চলের প্রশাসনিক ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা দুঃসাধ্য ব্যাপার। কারণ, যে সমস্ত এলাকা নিয়ে আজকের লালমনিরহাট জেলার ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারিত হয়েছে তা যুগে যুগে সামগ্রীক অথবা খন্ডিতভাবে বিভিন্ন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ছিল। যার প্রামাণ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা আজ আর মোটেও সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। তথাপি প্রাচীন তথ্য অবলম্বনে গবেষকগণের মূল্যবান লেখা থেকে সংক্ষেপে যতদূর জানা যায়, বর্তমান লালমনিরহাট জেলার অধিকাংশ এলাকা প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। রাজা নরক ছিলেন কামরূপ রাজ্যের অন্যতম পরাক্রমশালী রাজা। রাজা নরক অসুর বলে বিবেচিত হওয়ায় শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক এক যুদ্ধে নিহত হন। অতঃপর শ্রীকৃষ্ণ রাজা নরকের পুত্র ভগদত্তকে এ রাজ্যের সিংহাসন দান করেন। ভগদত্ত একজন পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন, কিন্তু বিরোধী পক্ষ অবলম্বন করায় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি অর্জুন কর্তৃক নিহত হলে শাসনভার গ্রহণ করেন তার কন্যা পায়রামতি। এভাবে নরক এর বংশধরদের দ্বারা মৌর্য শাসনামল পেরিয়ে গুপ্ত শাসনামলের সূচনালগ্ণ ৩২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাগজ্যোতিষপুর বা কামরুপ শাসিত হতে থাকে কখনও স্বাধীন কখনও বা করদ মিত্র রাজ্য হিসেবে। অতঃপর শুরু হয় বর্ম্মা বংশের রাজত্ব। গুপ্ত শাসনামলের ৩৮০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ভারতের খ্যাতনামা শাসক গুপ্ত কামরূপ অধিকার করেন। তৎকালে কামরূপ শাসন করতেন পুস্প বর্ম্মা নামে একজন শাসক। তিনি সমুদ্র গুপ্তের করদ মিত্র হন। এ বংশের শাসকদের মধ্যে সর্বশেষ ছিলেন ভাস্কর বর্ম্মা। ভাস্কর বর্ম্মার পর কামরূপে শালস্তম্ভ রাজবংশের রাজত্ব শুরু হয়। দশম শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত রাজত্ব করার পর রাজা ত্যাগসিংহ-এর শাসনের মধ্য দিয়ে এ রাজবংশের সমাপ্তি ঘটে। শালস্তম্ভ রাজবংশের পরে কামরূপ রাজ্যের সিংহাসনে বসেন কামরূপ পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা ব্রহ্ম পাল। এ রাজবংশের শাসনামলে রাজ্যে অরাজকতা দেখা দিলে কামরূপ পালবংশীয় রাজা ধর্ম পাল (১০৯০-১১২৫ খ্রিষ্টাব্দ) বারেন্দ্রীয় পাল বংশীয় শাসক রাম পাল কর্তৃক উৎখাত হন। অতঃপর করদ মিত্র হিসেবে রাজত্ব করেন তিগ্মদেব, বৈদ্যদেব ও রাজা পৃথু। সমসাময়িককালে সামন্ত সেনের দ্বারা সেন রাজবংশের গোড়াপত্তন ঘটে এবং সমতটের চন্দ্রবংশীয় রাজা মানিকচন্দ্র এ অঞ্চল সহ কামরুপের বিশাল এলাকা দখল করেন। অতঃপর কান্তেশ্বর নামে একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি কোচবিহারের গোসানীমারীতে রাজধানী স্থাপন করে কামতা-বিহার রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। শাসন কার্যের সুবিধার্থে কামতা-বিহার রাজ্য ৪টি প্রদেশে বিভক্ত ছিল- কাম পীঠ, ভদ্র পীঠ, সৌমার পীঠ ও রতণ পীঠ। এ অঞ্চল শাসিত হতো রতণ পীঠের আওতায়। বর্তমান লালমনিরহাট জেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নে বিদ্যমান বৃদ্ধেশ্বরী মন্দিরটি রাজা কান্তেশ্বর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বৃদ্ধেশ্বরী মন্দিরের ধ্বংসসহলে নির্মিত। রাজা কান্তেশ্বরের পর চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত কামরুপের শাসক হিসেবে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন- সন্ধ্যা, রুপ, সিংহধ্বজ, প্রতাপধ্বজ, ধর্ম নারায়ণ, দুর্লভ নারায়ণ ও ইন্দ্র নারায়ণ। পঞ্চদশ শতাব্দীতে কামতাধীপতি হিসেবে সেন বংশের গোড়াপত্তন ঘটে এবং কামরুপ অভিহিত হতে থাকে কামতাপুর নামে। আজকের লালমনিরহাটসহ রংপুর অঞ্চল শাসিত হতে থাকে কামতাপুরের অধীনে।
সেন শাসনামলে দিগ্বিজয়ী তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী পশ্চিম বঙ্গ বিজয় করেন। অতঃপর নদীয়া জয় করে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে লক্ষণাবতী (গৌড়) দখল করেন এবং রাজধানী স্থাপন করেন। নববিজিত রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি অধিকৃত এলাকাকে তিনটি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত করেন যার একটি হচ্ছে বারসৌল। বর্তমান দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট এলাকা বারসৌল বলে অভিহিত, যা প্রাচীন বরেন্দ্র ভূমির উত্তরাংশের (দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া) কেন্দ্রস্থল ছিল। বখতিয়ার খিলজী তিব্বত অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে কামরূপ বিজয়ে অগ্রসর হন। কামরূপে তার বাহিনী ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে তিনি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন এবং অল্পকাল পরে ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে নিহত হন। বখতিয়ার খিলজীর অকাল মৃত্যুতে রংপুর অঞ্চল আবার কামরূপের শাসনাধীনে চলে যায়।
রাজা চত্রুধ্বজের শাসনামলে (১৪৬০-১৪৮০) কামতাপুরে অভিযান চালান সুলতান রুকনউদ্দীন বারবাক শাহের মুসলিম সেনাপতি রহমত খাঁ এবং তৎপরবর্তী সময়ে সেনাপতি শাহ ইসমাইল গাজীর নেতৃত্বে ১৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কামতাপুর বিজয় হয়। কিন্তু সুলতান বারবাক শাহের ঘোড়াঘাটের হিন্দু ফৌজদার ভান্দসী রায়ের চক্রান্তে সেনাপতি শাহ ইসমাইল গাজী প্রাণদন্ডে দন্ডিত হলে মুসলমানদের এ বিজয় বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। অতঃপর সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ কামতাপুরে অভিযান চালিয়ে রাজা নীলাম্বরের প্রধানমন্ত্রী শচিপাত্রের সহায়তায় ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কামতাপুর দখল করেন। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ ১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এতদঞ্চলসহ কামতাপুর রাজ্য গৌড়ের অধীনে ছিল। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এর মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র সুলতান নাসির উদ্দীন নসরত শাহ এর আমলে কোচ জাতি খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে বিশু নামক জনৈক কোচ সর্দার সমগ্র কামতা রাজ্য দখল করে এখানকার মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে কোচবিহার রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা বিশু কোচ উপজাতীয় নাম পরিত্যাগ করে নিজ বংশকে রাজবংশী বলে অভিহিত করেন এবং মহারাজা বিশ্বসিংহ নাম ধারণ করে হিন্দু ধর্মকে রাজধর্ম বলে ঘোষণা করেন। বিশ্বসিংহের বংশধরেরা ১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কোচবিহার শাসন করেন। মোগল আক্রমনের পূর্ব পর্যন্ত বর্তমান লালমনিরহাটসহ গোটা রংপুর অঞ্চল কোচবিহার রাজ্যের অংশ ছিল।
১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই বিহারে রাজমহলের যুদ্ধে সুলতান দাউদ খান মোগল সম্রাট আকবরের বাহিনীর কাছে পরাজিত হলে বাংলায় মোগল শাসনের সুত্রপাত ঘটে। এ সময় কোচ রাজা নরনারায়ণের মাধ্যমে কোচবিহার রাজ্য মোগল সামাজ্যের করদ মিত্র রাজ্যে পরিণত হয় এবং ১৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যু পর্যন্ত বজায় ছিল। নরনারায়ণের মৃত্যুর পর লক্ষ্মীনারায়ণ ও রঘুদেবের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের কারণে লক্ষ্মী নারায়ণ মোগল শক্তির সাথে মিত্রতার বন্ধনকে আরও অটুট করেন। সম্রাট আকবরের পর সিংহাসনে আরোহণ করেন জাহাঙ্গীর। মহারাজা লক্ষ্মীনারায়ণের মৃত্যুর পর কোচবিহারের পরবর্তী মহারাজাদের সাথে মোগলদের যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকে।
কোচবিহারের মহারাজা প্রাণনারায়ণ মোগল সম্রাটের আনুগত্য অস্বীকার করেন এবং মোগল অধীকৃত কামরূপ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। এ সময় আসামের রাজা জয়ধ্বজ মোগল সাম্রাজ্যের বিরোধীতা শুরু করেন এবং কামরূপে মোগল বিরোধী অভিযান চালিয়ে সমগ্র কামরূপ দখল করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে বাংলার সুবাদার নিয়োগ করার পর তিনি কোচবিহার ও কামরূপে মোগল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত হন এবং ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দের ১ নভেম্বর কোচবিহার অভিমুখে অভিযান চালান। মহারাজা প্রাণনারায়ণ ভয়ে রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে গেলে মীর জুমলা ১৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ডিসেম্বর কোচ রাজধানী অধিকার করেন, ফলে কোচবিহার পুনরায় মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে কোচবিহার পুনরায় মহারাজা প্রাণনারায়ণের হস্তগত হয়। একই খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানকে বাংলার সুবাদার নিয়োগ করেন। তিনি কোচবিহার আক্রমন করবেন বলে জানতে পেয়ে মহারাজা প্রাণনারায়ণ ভয়ে বশ্যতা স্বীকার করেন এবং যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন সম্রাটকে নিয়মিত কর প্রদান করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর কোচবিহারের সিংহাসন নিয়ে গৃহ বিবাদ শুরু হয় এবং মোদ নারায়ণ সিংহাসন অধিকার করেন। মোদ নারায়ণ সম্রাটকে বার্ষিক ১০ লক্ষ টাকা কর প্রদানে অঙ্গীকার করেন, কিন্তু কয়েক বছর পর কর প্রদানে গড়িমসি শুরত করলে সুবাদার শায়েসতা খান ১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তার পুত্র এবাদত খানের নেতৃত্বে কোচবিহারে অভিযান প্রেরণ করেন। এ অভিযানে মহারাজা মোদ নারায়ণ পরাজিত হন এবং ১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দে কোচবিহার আবারও করদ মিত্র হিসেবে মোগল সাম্রাজ্যভূক্ত হলেও এ সময় কোচবিহারের তিনটি পরগনা ফতেহপুর, কাযিরহাট ও কাকিনা সহায়ীভাবে বাংলা সুবাদারীর অন্তর্ভূক্ত হয়।
আইন-ই-আকবরীর বিবরণ অনুযায়ী তিন ধরণের প্রশাসনিক এলাকা নিয়ে মোগল রংপুর গঠিত ছিল। প্রথমতঃ ঘোড়াঘাট সরকারের কিছু অংশ, যা পরগনা পাতিলাদহ, কুন্তি, স্বরূপপুর এবং রোকনপুর। দ্বিতীয়তঃ সরকার বাঙ্গালভূম, যা পরগনা ভিতরবন্দ ও বাহারবন্দ (ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলা বাদে বর্তমান কুড়িগ্রাম জেলা এবং গাইবান্ধা জেলা)। তৃতীয়তঃ রংপুর সদর যা সরকার কোচবিহার বা কাছওয়ারা নামে অভিহিত ছিল। এটি ৬টি পরগনা নিয়ে গঠিত ছিল; কাযিরহাট (বর্তমান নীলফামারী জেলা), কাকিনা (বর্তমান পাটগ্রাম উপজেলা বাদে লালমনিরহাট জেলার অধিকাংশ এলাকা), ফতেহপুর (বর্তমান কাউনিয়া, পীরগাছা, বামনডাঙ্গা, নলডাঙ্গা এলাকা), বোদা (বর্তমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলা), পাটগ্রাম (বর্তমান লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলা) এবং পূর্বভাগ (বর্তমান কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার কিয়দাংশ)। ১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পাটগ্রাম, বোদা এবং পূর্বভাগ পরগনা বাদে উল্লিখিত তিন ধরনের প্রশাসনিক এলাকা মোগলদের দখলে আসে। এসময় পূর্বভাগ পরগনায় কোচবিহার মহারাজার জমাদার ছিলেন জান মোহাম্মদ। পরে তিনি গোমস্তা হন এবং অবশেষে চৌধুরী হিসেবে নিযুক্ত হন। বাকী তিনটি পরগনা দখল করতে মোগলদের আরও ২৪ বছর অতিবাহিত হয়। ১৭১১ খ্রিষ্টাব্দে কোচবিহার মহারাজা রূপনারায়ণের সময় বাকী তিনটি পরগনা চূড়ান্তভাবে মোগল সামাজ্যভূক্ত হলে সন্ধির মাধ্যমে কর দানের স্বীকৃতিতে মোগলদের নিকট থেকে মহারাজা কর্তৃক তা ইজারা হিসেবে গৃহীত হয়।
ইতিহাস বিশ্লেষণে জানা যায়, আজকের লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকা একেক সময় একেক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তা শাসিত হয়েছিল কখনও চাকলাদার-তালুকদার-গোমস্তা-জমিদারগণের দ্বারা, কখনও বা চৌধুরী-জমিদার-জোতদারগণের দ্বারা। মোগল ও বৃটিশ আমলে স্থানীয় পর্যায়ে এ এলাকা শাসিত হয়েছিল চৌধুরী- জমিদার-জোতদারগণের দ্বারা। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন পাঙ্গা পরগনা, পূর্বভাগ পরগনা, কাকিনা পরগনা, তুষভান্ডার জমিদারী (উপেনচৌকি তালুক তথা দেবোত্তর এস্টেট ও কাযিরহাট পরগনার কিয়দাংশ) এবং পাটগ্রাম পরগনার অংশ নিয়েই মূলতঃ আজকের লালমনিরহাট জেলার ভৌগলিক সীমানা গঠিত। পরবর্তীতে বিবিধ কারণে এ জেলার বর্তমান ভৌগোলিক সীমানার বিভিন্ন অংশ অন্যান্য পরগনার সাথে যুক্ত হয় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে অনেক পরগনার অধীনে শাসিত হতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা বৃটিশ কর্তৃক দেওয়ানী লাভের পর শাসন কার্যের সুবিধার্থে ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর কালেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তা পুর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে। ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সমগ্র বাংলায় ঘোড়াঘাটসহ মোট ৩৫টি কালেক্টরেট বা জেলার সৃষ্টি করা হয়। এক বছর পর ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জেলার সংখ্যা কমিয়ে ২৩টি করা হয়। এ সময় ঘোড়াঘাট জেলার বিলুপ্তি ঘটে এবং বর্তমান গাইবান্ধা অঞ্চল (ইন্দ্রাকপুর) চলে আসে রংপুর কালেক্টরেট এর অধীনে। পরবর্তীতে ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের সময় কোম্পানি সরকার জেলাসমূহকে মহকুমায় বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ সময় বৃহত্তর রংপুর জেলা বিভক্ত হয় ২টি মহকুমায় যথা মাহিগঞ্জ (রংপুর) এবং ভবানীগঞ্জ।
শাসন কার্যের সুবিধার্থে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে অনেক থানা বাতিল করে নতুন থানা গঠন, অন্য স্থানে স্থানান্তর, পুনর্বিন্যাস এমনকি নতুন জেলাও গঠিত হয়েছিল। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে জলপাইগুড়ি নামে একটি নতুন জেলা সৃষ্টি করা হয়। এ সময় বোদা, ফকিরগঞ্জ ও সন্ন্যাসীকাটা থানার সাথে পাটগ্রাম থানাও জলপাইগুড়ি জেলাভূক্ত হয়, পরে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের বদৌলতে পাটগ্রাম থানা পুনরায় রংপুরের সাথে সংযুক্ত হয়। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে বড়বাড়ী থানা কুলাঘাটে এবং ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে ফুরুনবাড়ী থানা কালীগঞ্জে স্থানান্তরিত হয়। ৩৮.১৫ একর জমি হুকুম দখল করে লালমনিরহাটে রেলওয়ে জংশন স্টেশনের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে। কুলাঘাটকে বাতিল করে লালমনিরহাটকে থানা হিসেবে ঘোষণা করা হয় ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে লালমনিরহাট রেলওয়ে জংশন স্টেশনের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে থানা হেডকোয়ার্টাস লালমনিরহাটে স্থানান্তরিত হয় ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে। অতঃপর ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে কালীগঞ্জ থানার অংশ নিয়ে হাতীবান্ধা থানা গঠিত হয়।
প্রাচীন দলিল-দস্তাবেজ নিরিখে জানা যায়, ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে আজকের রংপুরকে 'রঙ্গপুর' বলে উল্লেখ করা হতো। ধিরে ধিরে 'রঙ্গপুর' পরিবর্তিত হয়ে রংপুর বলে অভিহিত হতে থাকে। যা হোক, প্রশাসনিক সুবিধার্থে ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে মাহিগঞ্জ ও ভবানীগঞ্জ মহকুমার থানাসমূহকে একত্রিত করে রংপুর জেলার অধীনে মোট ৪টি মহকুমার সৃষ্টি করা হয়। মহকুমা গুলো হচ্ছে রংপুর সদর, ভবানীগঞ্জ, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম। পরে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গনের কারণে ভবানীগঞ্জ মহকুমার সদর দপ্তর গাইবান্ধায় স্থানান্তর করা হয়। কুড়িগ্রাম মহকুমা হওয়ার পর কুলাঘাট থানা এ মহকুমার আওতায় পড়ে এবং মুন্সেফ আদালত বড়বাড়ী থেকে কুড়িগ্রামে স্থানান্তর হয়।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জানুয়ারি সাপটানা, খোর্দ্দসাপটানা, খুটামারা ও খোঁচাবাড়ী মৌজার সমন্বয়ে ৭ বর্গমাইল আয়তন বিশিষ্ট লালমনিরহাট পৌরসভা গঠিত হয়। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর জেলার অধিনে বিদ্যমান ৪টি মহকুমা হচ্ছে রংপুর সদর, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঝটিকা সফরের এক পর্যায়ে লালমনিরহাট আসেন এবং লালমনিরহাটবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে সোহরাওয়ার্দী ময়দানের জনসভায় লালমনিরহাটকে মহকুমায় উন্নীত করণের আশ্বাস প্রদান করেন। ফলস্বরূপ ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রংপুর জেলার ৪টি মহকুমা ভেঙ্গে ৫টি করা হয়। মহকুমা ৫টি হচ্ছে রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম এবং লালমনিরহাট। রংপুর সদর মহকুমার পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা ও কালীগঞ্জ থানা এবং কুড়িগ্রাম মহকুমার লালমনিরহাট থানা নিয়ে ৪৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার সমন্বয়ে লালমনিরহাট মহকুমা গঠিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রী মেজর জেনারেল (অবঃ) ম. মজিদ-উল হক প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত তারিখ অনুযায়ী ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি লালমনিরহাট মহকুমার শুভ উদ্বোধন করেন, যা ছিল বাংলাদেশের ৭১তম মহকুমা। খোর্দ্দ সাপটানাসহ ক্যাথলিক চার্চের সামনে বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, লালমনিরহাট এর বর্তমান কার্যালয়ের স্থলে ছিল মহকুমা প্রশাসকের প্রথম কার্যালয়। লালমনিরহাট মহকুমার প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন লুৎফর রহমান চৌধুরী। এ সময় রংপুরের জেলা প্রশাসক ছিলেন ম. মাহে আলম এবং কুড়িগ্রামের মহকুমা প্রশাসক ছিলেন মনজুরুল ইসলাম। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল কালীগঞ্জ থানার ৭৫ বর্গমাইল অংশ নিয়ে আদিতমারী থানা গঠিত হয়। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতি অবলম্বনে ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রতিটি মহকুমাকে জেলায় এবং থানাকে উপজেলায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ থানা, ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর আদিতমারী থানা, ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ এপ্রিল হাতীবান্ধা এবং পাটগ্রাম থানা উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী) ডঃ শাফিয়া খাতুন কর্তৃক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে লালমনিরহাট মহকুমা 'জেলা' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ মার্চ লালমনিরহাট সদর থানা 'উপজেলা' হিসেবে ঘোষিত হয়। ফলে লালমনিরহাট জেলার অধীনে উপজেলার সংখ্যা দাড়ায় ৫টি; পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী এবং লালমনিরহাট সদর। এসময় লালমনিরহাট সদর থানার ছিনাই, রাজারহাট এবং ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন পাশ্ববর্তী কুড়িগ্রাম জেলার সাথে যুক্ত হলে নবগঠিত লালমনিরহাট জেলায় ইউনিয়নের সংখ্যা দাড়ায় ৪১টি এবং পৌরসভার সংখ্যা ১টি। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমহল পাটগ্রাম উপজেলার একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন 'দহগ্রাম ইউনিয়ন' হিসেবে পরিগনিত হয় এবং ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ আগস্ট এখানে ইউনিয়ন পরিষদের শুভ উদ্বোধন ঘটে। ফলে লালমনিরহাট জেলায় ইউনিয়ন সংখ্যা দাড়ায় ৪২টি। ডায়াবেটিক সমিতি, লালমনিরহাট এর সাবেক কার্যালয়ের স্থলে ছিল জেলা প্রশাসকের প্রথম কার্যালয়। লালমনিরহাট জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন মনজুরুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার ছিলেন এ. এইচ. এম. নুরুদ্দিন খান। লালমনিরহাট 'মহকুমা' থেকে জেলায় উন্নীত হওয়ার সময় রংপুরের জেলা প্রশাসক ছিলেন মোসাদ্দর আলী। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক কার্যালয় স্থানান্তরিত হয় বর্তমান মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের স্থলে। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে আবার তা স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমান স্থানে চলে আসে। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি বিদ্যমান জেলা প্রশাসক কার্যালয় তথা কালেক্টরেট ভবনের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচ. এম. এরশাদ।
লালমনিরহাট নামকরণের কারন
এ জেলার নাম কেন লালমনিরহাট হলো সে সম্পর্কে বেশ কয়েকটি মত চালু আছে। সেগুলো হলো- 1. উনবিংশ শতাব্দিতে যখন বেংগল ডুয়ার্স রেল লাইন তৈরির জন্য মাটি খননের কাজ চলছিল তখন শ্রমিকরা এখানে মাটিন নিচে লাল পাথর দেখতে পায়। সেই থেকে এ জায়গার নাম হয়েছে 'লালমনি'। 2. অন্য মতানুসারে বৃটিশ রেলওয়ে যে মহিলার জমি অধিগ্রহণ করেছিল তার নাম ছিল লালমনি। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এলাকার লোকজন এ জায়গার নাম রাখে 'লালমনি'। 3. অন্য আরেকটি মত হলো, ১৭৮৩ সালে সাধারণ কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লালমনি নামে এক মহিলা কৃষক নেতা নুরুলদিনকে সাথে নিয়ে বৃটিশ সৈন্য ও জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে। সেই থেকে এ জায়গার নাম হয় 'লালমনি'।
|